Connect with us

ফিচার

ন্যানো ডেন্টিস্ট্রি

Published

on

Dental Times

ন্যানো অর্থ একশ কোটি ভাগের এক ভাগ। অতি ক্ষুদ্র এসব কণিকার কাজ করার বৈশিষ্ট্য বা গুণ বড় বড় কণা বা পদার্থদের থেকে অনেক আলাদা হয়। ন্যানো ডেন্টাল কণিকার আবিষ্কার দাঁতের চিকিত্সাবিজ্ঞানকে করে তুলেছে আরও আকর্ষণীয়। ন্যানো পাউডার, ন্যানো কম্পোজিট এবং এ ধরনের আরও ন্যানো কণিকা, ন্যানো ফিলার ও অন্যান্য ন্যানো যন্ত্রের বিকাশ দন্ত চিকিত্সাকে উন্নত করছে দিন দিন।

দাঁতের চিকিত্সায় আজকাল সাদা কম্পোজিট ফিলিংয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে সিলিকা ও জিরকোনিয়ামের ন্যানো কণিকার মিশ্রণ। ন্যানো কম্পোজিট রেজিন বাড়িয়ে দিচ্ছে ফিলিংয়ের স্থায়িত্ব। দাঁতের স্বাভাবিক রঙের সঙ্গে এর রঙের মিল রয়েছে। তাই ফিলিংয়ের পরে দাঁত দেখতে আর কটু হচ্ছে না, সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন থাকছে প্রায় শতভাগ। আবার ক্রাউন বা ব্রিজ করতে ব্যবহার করা হচ্ছে ন্যানো আকৃতির ইট্রিয়াম, যা ক্রাউনের স্থাপনাকে করছে আরও মজবুত।

এসব ন্যানো কণিকার অনেকেরই থাকে সেলফ-হিলিং ক্যাপাসিটি। তাই এরা ক্ষয়প্রাপ্ত হলে নিজেরাই সেই ক্ষয় রোধ করতে সক্ষম। এরা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ ঠেকিয়ে দিতে পারে। ফলে দাঁত অনেক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পায়।

ন্যানো কণিকা ব্যবহার করা হচ্ছে দাঁতের রোগ শনাক্ত করতেও। দাঁতের ক্ষয়রোগের প্রধান কারণ দাঁতের ওপর জীবাণুদের বিস্তার। দীর্ঘ সময় ধরে জীবাণুরা দাঁতের ওপর একধরনের বায়োফিল্ম বা পরত তৈরি করে। এসব জীবাণু ধ্বংস করতে হলে তাদের আগে চিহ্নিত করতে হয়। আর এই প্রক্রিয়া অনেক লম্বা।

ন্যানো ডেন্টিস্ট্রিতে এসব জীবাণু শনাক্ত করতে ব্যবহার করা হচ্ছে কোয়ান্টাম-ডট ন্যানো কণিকা। এসব কোয়ান্টাম-ডট দাঁতের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে এলেই জ্বলে ওঠে। ফলে সহজেই অণুবীক্ষণ যন্ত্রের আলোতে শনাক্ত করা যায়। কোয়ান্টাম-ডট তার প্রতিপ্রভা ক্ষমতার মাধ্যমে মুখগহ্বরে কোনো ক্ষতিকর কোষ থাকলে আলো নিঃসরণ করতে পারে। মুখের ক্যানসার নির্ণয়েও খুবই কার্যকর হতে পারে এই প্রযুক্তি।

টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিং ডেন্টিস্ট্রি বিজ্ঞানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। মুখের ফ্র্যাকচার, কার্টিলেজ বা লিগামেন্ট পুনর্গঠন, হাড়ের বৃদ্ধি ইত্যাদিতে টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভূমিকা অপরিসীম। এই প্রক্রিয়ায় বর্তমানে ব্যবহূত বিভিন্ন জৈব পলিমারের সঙ্গে ন্যানো উপাদান যুক্ত করে পুনর্গঠিত লিগামেন্ট বা হাড়কে আরও মজবুত ও স্থায়ী করা যেতে পারে। ইদানীং অনেক টুথপেস্টেও ব্যবহার করা হচ্ছে ন্যানো আকৃতির ক্যালসিয়াম কার্বনেট। ফলে রিমিনারালাইজেশন প্রক্রিয়ায় দাঁতের এনামেলের প্রাথমিক ক্ষত সারানো সম্ভব হয়েছে। কিছু কিছু পেস্টে যুক্ত করা হয়েছে সিলভারের ন্যানো কণিকা। এই কণিকাগুলো দাঁতের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া স্ট্রেপটোকক্কাস মিউট্যান্সের বিস্তার কমিয়ে দিতে পারে। ফলে ওই ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে ক্ষত সৃষ্টির হার কমে যায়।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ন্যানো ডেন্টিস্ট্রিই হবে ভবিষ্যতের মূল দন্ত চিকিত্সা। এই পদ্ধতিতে ন্যানো কণিকা ব্যবহারের পাশাপাশি ডেন্টাল হাইজেনিস্ট, অ্যাসিস্ট্যান্ট ও টেকনিশিয়ানদের ভূমিকা পালন করবে কার্বন ‘ন্যানো রোবট’। ভবিষ্যতের এই রোবটগুলো আকৃতিতে ১০০ ন্যানো মিটারের কাছাকাছি হবে। এরা কাজ করতে পারবে কোষ থেকে শক্তি নিয়ে। কম্পিউটারের সঙ্গে সিগন্যালের মাধ্যমে যুক্ত থাকবে এই রোবটগুলো। ফলে এদের নিয়ন্ত্রণ করা যাবে অনায়াসে।

ভবিষ্যতে দাঁতের চিকিত্সকেরা ডেন্টাল রোবটগুলো ব্যবহার করবেন দাঁত অবশ করতেও। কোলয়ডাল সাসপেনশনে থাকা মিলিয়ন মিলিয়ন ন্যানো রোবট মাড়ির পাশ দিয়ে প্রায় ১০০ সেকেন্ডের মধ্যে দাঁতে ঢুকতে পারবে। তারপর পাল্পে করে দাঁতের কম্পিউটারের নির্দেশ অনুযায়ী দাঁতের স্নায়ুগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। সুতরাং দাঁতের চিকিত্সক ও রোগী উভয়ের জন্যই এ ধরনের ন্যানোটেকনোলজি ব্যবহার সুবিধাজনক হবে।

দাঁত শিরশির করার সমস্যা অর্থাৎ ডেন্টিন সেনসিটিভিটিতে কমবেশি সবাই ভোগেন। ডেন্টিন হলো দাঁতের দ্বিতীয় স্তর। ধারণা করা হয়, ডেন্টিন টিউবিউলগুলো নার্ভাস সিস্টেমকে সিগন্যাল পাঠিয়ে উদীপ্ত করে। ফলে দাঁতে শিরশির অনুভূতি হয়। সাধারণ চিকিত্সা পদ্ধতিতে এই অনুভূতি থেকে সাময়িক পরিত্রাণ পাওয়া যায়। কিন্তু স্থায়ী মুক্তি মেলে না। ন্যানোরোবট ব্যবহার করে শিরশিরে অনুভূতির জন্য দায়ী ডেন্টিন টিউবিউলগুলোকে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া যাবে।

অর্থোডেন্টিক ইউনিট আঁকাবাঁকা দাঁত সোজা করার বিষয়টি সমাধান করে। দাঁতের ব্রেইসের সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। এই পদ্ধতিতে দাঁত সোজা করতে লেগে যায় বছরের পর বছর। দীর্ঘমেয়াদি এই চিকিত্সাপদ্ধতিকে বদলে দিতে পারে ভবিষ্যতের অর্থোডেন্টিক ন্যানো রোবট। এই রোবটগুলো সরাসরি দাঁতের চারপাশের টিস্যু, পেরিওডন্টাল লিগামেন্ট, সিমেন্ট, হাড় ইত্যাদির গঠন বদলে প্রয়োজনমতো দাঁতের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। এভাবে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় আঁকাবাঁকা দাঁত সোজা করে ফেলতে সক্ষম হবে বলে ধারণা করছেন দন্ত বিজ্ঞানীরা।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, শিগগিরই ন্যানো টেকনোলজির কল্যাণে দাঁতের সমস্যা শনাক্তকরণ, দাঁত অবশকরণ থেকে শুরু করে দাঁতের সব ধরনের চিকিত্সায় ব্যবহৃত উপাদান এবং অস্ত্রোপচারের আমূল পরিবর্তন আসবে। ন্যানো উপাদান, ন্যানো রোবট, ন্যানো সার্জারি, ন্যানো ওষুধ ইত্যাদির প্রয়োগ দাঁতের চিকিত্সাব্যবস্থাকে নিয়ে যাবে ভিন্ন স্তরে।

লেখক: নুসরাত জাহান, সহকারী দন্ত চিকিৎকক, কিংস কলেজ লন্ডন, যুক্তরাজ্য
সূত্র: ইউরোপিয়ান জার্নাল অব ডেন্টিস্ট্রি

Advertisement
Click to comment

ফিচার

দাঁত ব্যথা : নিদারুণ এক যন্ত্রণার ইতিহাস

Published

on

Dental Times

মধ্যযুগের একটা শহরের বাজারে, জাঁকালো পোশাক-পরা একজন হাঁতুড়ে ডাক্তার দম্ভের সঙ্গে বলছেন যে, তিনি কোনোরকম ব্যথা না দিয়েই দাঁত তুলতে পারেন। তার সহকারী, কিছুটা গড়িমসি ভাব করেন, সামনে এগিয়ে যান আর সেই হাতুড়ে ডাক্তার তার সহকারীর একটা দাঁত তোলার ভান করেন, একটা রক্তাক্ত দাঁত ওপরে তুলে সবাইকে দেখান। এরপর, দাঁত ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছে এমন ব্যক্তিরা সঙ্গে সঙ্গে টাকা দিয়ে দাঁত তুলতে উৎসাহিত হয়। প্রচণ্ড জোরে ড্রাম ও তুরী বাজানো হয়, যাতে তাদের ব্যথার চিৎকার শুনে অন্যেরা দাঁত তোলা থেকে বিরত না হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই, সেই জায়গায় কখনো কখনো মারাত্মক পচন ধরে কিন্তু ততদিনে সেই হাঁতুড়ে ডাক্তার উধাও হয়ে গিয়েছেন।

আজকে দাঁত ব্যথায় ভুগছে এমন অল্প লোকেরই এই ধরনের ভণ্ড ব্যক্তিদের কাছে দাঁত তোলার জন্য যেতে হয়। আধুনিক দন্তচিকিৎসকরা ব্যথা উপশম করতে পারে এবং তারা প্রায়ই দাঁত পড়ে যাওয়াকে রোধ করতে পারে। তা সত্ত্বেও, অনেক লোক একজন দন্তচিকিৎসকের কাছে যেতে ভয় পায়। দন্তচিকিৎসকরা তাদের রোগীদের ব্যথা উপশম করার বিষয়টা প্রথমে কীভাবে শিখেছিল, তা বিবেচনা করা আমাদের হয়তো আধুনিক দন্তচিকিৎসার প্রতি কৃতজ্ঞ হতে সাহায্য করবে।

সাধারণ সর্দিকাশির পর দন্তক্ষয়ই হচ্ছে মানবজাতির দ্বিতীয় সাধারণ রোগ। এটা শুধুমাত্র আধুনিক সময়ের কোনো রোগ নয়। রাজা শলোমনের কাব্য প্রকাশ করে যে, “প্রাচীন ইস্রায়েলে বয়স্ক লোকেদের অল্প কয়েকটা দাঁত থাকার অস্বস্তি এক সাধারণ বিষয় ছিল।” – উপদেশক ১২:৩.

এমনকি রাজবংশীয় লোকেরাও ভুগেছিল এই দাঁত ব্যথা নামক যন্ত্রণায়। এলিজাবেথ ১ম, যদিও ইংল্যান্ডের রানি ছিলেন কিন্তু তিনি পর্যন্ত দাঁত ব্যথা থেকে রেহাই পাননি। রানির কালো দাঁত দেখে একজন জার্মান পর্যটক রিপোর্ট করেছিলেন যে, ‘প্রচুর পরিমাণে চিনি খাওয়ার কারণে’ এটা ‘ইংরেজদের একটা সাধারণ খুঁত বলে মনে হয়।’ ১৫৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে, দাঁত ব্যথার কারণে রানি রাতদিন প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ভুগেছিলেন। তার চিকিৎসকরা তাকে রোগাক্রান্ত দাঁত তুলে ফেলার পরামর্শ দিয়েছিল কিন্তু তিনি তাতে সম্মত হননি, সম্ভবত ব্যথার কথা ভেবে তিনি ভয় পেয়েছিলেন। তাকে দাঁত তুলতে রাজি করানোর জন্য লন্ডনের বিশপ জন এলমার, রানির সামনে সম্ভবত তার নিজের একটা ক্ষয়প্রাপ্ত দাঁত তুলে ফেলার ব্যবস্থা করেছিলেন—এক দুঃসাহসিক ও আত্মত্যাগমূলক কাজ, কারণ এই বয়স্ক ব্যক্তির মাত্র অল্প কয়েকটা দাঁতই অবশিষ্ট ছিল!

Dental Times

সেই সময়ে, যেসব সাধারণ লোকের দাঁত তোলার প্রয়োজন হতো, তারা এর জন্য একজন ক্ষৌরকার অথবা এমনকি একজন কামারের কাছে যেত। কিন্তু যখন বেশির ভাগ লোকের চিনি কেনার সামর্থ্য হয়েছিল, তখন থেকে দাঁত ব্যথা বৃদ্ধি পেয়েছিল আর সেইসঙ্গে দাঁত তোলায় দক্ষ ব্যক্তিদের চাহিদাও বেড়ে গিয়েছিল। এই কারণেই, কিছু চিকিৎসক এবং সার্জন রোগাক্রান্ত দাঁতের চিকিৎসা করার প্রতি আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছিল। কিন্তু, এই বিষয়টা তাদের নিজে নিজে শিখতে হয়েছিল কারণ বিশেষজ্ঞরা ঈর্ষাবশত তাদের ব্যবসায়িক কলাকৌশলকে গোপন রাখত। এ ছাড়া, এই বিষয়ের ওপর বইপত্রের সংখ্যাও খুব বেশি ছিল না।

এলিজাবেথ ১ম এর সময়কালের একশো বছর পর, চতুর্দশ লুই ফ্রান্সে রাজা হিসেবে শাসন করেছিলেন। তিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় দাঁত ব্যথায় ভুগেছিলেন এবং ১৬৮৫ সালে তিনি তার ওপরের পাটির বাম দিকের সব দাঁত তুলে ফেলেছিলেন। কেউ কেউ দাবি করে যে, রাজার দাঁতের সংক্রমণই সেই বছর তার দ্বারা নেওয়া এক ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্তের কারণ, যার ফলে তিনি ফ্রান্সে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করার এক চুক্তিতে সই করেছিলেন, যে-পদক্ষেপটা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে এক তীব্র তাড়নার ঢেউ বইয়ে দিয়েছিল।

আধুনিক দন্তচিকিৎসার উৎপত্তি নিয়ে আগ্রহ থেকে ঘাঁটাঘাটি করতে গিয়ে দেখা যায় প্যারিসের শৌখিন সমাজে, চতুর্দশ লুইয়ের ব্যয়বহুল জীবনধারার প্রভাব দন্তচিকিৎসা পেশার উৎপত্তি ঘটিয়েছিল। বিচারালয় এবং সমাজে সফল হওয়াটা একজনের বাহ্যিক সৌন্দর্যের ওপর নির্ভর করত। খাবার খাওয়ার চাইতে চেহারার সৌন্দর্য রক্ষায় নকল দাঁত বেশি ব্যবহৃত হওয়ায় এর চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল আর এর ফলে সার্জনদের দাঁত ব্যথার শিকার অভিজাত শ্রেণীর লোকেদের জন্য কর্মরত দন্তচিকিৎসকদের এক নতুন দলের উদ্ভব হয়েছিল। প্যারিসের প্রধান দন্তচিকিৎসক ছিলেন পিয়ার ফশার।  যিনি ফ্রেঞ্চ নৌবাহিনীতে থাকার সময় অপারেশন করতে শিখেছিলেন। তিনি সেই সার্জনদের সমালোচনা করেছিলেন, যারা দাঁত তোলার কাজটা অদক্ষ ক্ষৌরকার ও হাঁতুড়ে ডাক্তারদের ওপর ছেড়ে দিয়েছিল আর তিনিই প্রথম নিজেকে একজন ডেন্টাল সার্জন হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

ব্যাবসায়িক কলাকৌশল গোপন করে রাখার ধারা ভঙ্গ করে, ফশার ১৭২৮ সালে একটি বই লিখেছিলেন, যেখানে তিনি তার জানা সমস্ত পদ্ধতি প্রকাশ করেছিলেন। ফলে, তিনিই “দন্তচিকিৎসাবিদ্যার জনক” বলে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি রোগীদেরকে মেঝেতে বসানোর পরিবর্তে বিশেষ এক ধরনের চেয়ারে বসিয়েছিলেন। এ ছাড়া, ফশার দাঁত তোলার জন্য পাঁচটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেছিলেন, তবে তিনি শুধুমাত্র দাঁতই তুলতেন না। তিনি দাঁতের চিকিৎসার জন্য এক ধরনের ছোট্ট ড্রিল মেশিনের এবং দাঁতের মধ্যে সৃষ্ট গর্ত ভরাট করার বিভিন্ন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন। তিনি রুট ক্যানেল করা এবং দন্তমূলে এক কৃত্রিম দাঁত বসাতেও শিখেছিলেন। তার ডেন্‌চার (কৃত্রিম দাঁতের পংক্তি) যেটা হাতির দাঁত থেকে খোদাই করে তৈরি করা হয়েছিল, সেটাতে একটা স্প্রিং লাগানো ছিল, যাতে ডেন্‌চারের ওপরের অংশটুকু জায়গামতো বসানো যায়। ফশার দন্তচিকিৎসাকে একটা পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার খ্যাতি এমনকি আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে আমেরিকাতেও প্রসারিত হয়েছিল।

রাষ্ট্রপতির মত ব্যাক্তিও রেহাই পায় নি দাঁত ব্যথা নামক নরক যন্ত্রণা থেকে। চতুর্দশ লুইয়ের শাসনের একশো বছর পর, আমেরিকাতে জর্জ ওয়াশিংটন দাঁত ব্যথায় ভুগেছিলেন। ২২ বছর বয়স থেকে প্রায় প্রতি বছরই তাকে তার দাঁত তুলতে হয়েছিল। কন্টিনেন্টাল আর্মি-কে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় তিনি যে-যন্ত্রণায় ভুগেছিলেন, তা একটু কল্পনা করুন! ১৭৮৯ সালে তিনি যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন, সেই সময়ের মধ্যে তার প্রায় সব দাঁতই পড়ে গিয়েছিল।

দাঁত পড়ে যাওয়ার কারণে চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় ও সেইসঙ্গে তার মুখে বসানো নড়বড়ে ডেন্‌চারের কারণে জর্জ ওয়াশিংটন মানসিক যন্ত্রণায়ও ভুগেছিলেন। তিনি এক নতুন দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য জনগণের সামনে এক উত্তম ভাবমূর্তি তুলে ধরার সংগ্রাম করার সময় তার চেহারা সম্বন্ধে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। সেই সময়ে ডেন্‌চারগুলোকে ছাঁচে ঢেলে আকার দেওয়া হতো না কিন্তু হাতির দাঁত থেকে খোদাই করে তৈরি করা হতো আর তাই সেগুলো যথাস্থানে বসানো খুব মুশকিল ছিল। ইংরেজ লোকেরাও ওয়াশিংটনের মতো একই অসুবিধাগুলো ভোগ করেছিল। কথিত আছে যে, হাস্য-রসাত্মক কথাবার্তার সময় তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাসার পরিবর্তে মুচকি হাসি হাসতো, যাতে তাদের নকল দাঁত লুকাতে পারে।

এমন কথা প্রচলিত আছে যে, ওয়াশিংটন কাঠের তৈরি ডেন্‌চার ব্যবহার করতেন কিন্তু এটা স্পষ্টতই মিথ্যা। তার ডেন্‌চার মানুষের দাঁত, হাতির দাঁত এবং সীসা দিয়ে তৈরি ছিল কিন্তু কাঠ দিয়ে নয়। তার দন্তচিকিৎসকরা সম্ভবত কবর লুটকারীদের কাছ থেকে দাঁত সংগ্রহ করেছিল। এ ছাড়া, দাঁত ব্যবসায়ীরা সৈন্যদের পিছনে পিছনে যেত এবং যুদ্ধের পর নিহত বা মারা যাচ্ছে এমন সৈন্যের দাঁত তুলে নিত। তাই, ডেন্‌চার বসানো ধনী ব্যক্তিদের বিলাসিতার এক বিষয় ছিল। ১৮৫০ দশকে ভালকানাইজড রবার আবিষ্কৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটা ডেন্‌চারের ভিত হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে এবং তখন থেকে ডেন্‌চার সাধারণ লোকেদের কাছে প্রাপ্তিসাধ্য হয়ে উঠে। জর্জ ওয়াশিংটনের দন্তচিকিৎসকরা এই পেশায় অগ্রদূত হওয়া সত্ত্বেও, তারা দাঁত ব্যথার কারণ পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি।

প্রাচীনকাল থেকেই লোকেরা মনে করত যে, এক ধরনের পোকা দাঁত ব্যথার কারণ—যে-ধারণাটা ১৭০০ শতাব্দী পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। ১৮৯০ সালে, উইলোবি মিলার নামে আমেরিকার একজন দন্তচিকিৎসক, জার্মানির বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার সময় দন্তক্ষয়ের কারণ শনাক্ত করেছিলেন, যা দাঁত ব্যথার একটা প্রধান কারণ। বিশেষভাবে চিনির মধ্যে বৃদ্ধি পায় এমন এক নির্দিষ্ট ধরনের ব্যাকটিরিয়া অম্ল উৎপন্ন করে, যা দাঁতকে আক্রান্ত করে। কিন্তু, দন্তক্ষয়কে কীভাবে রোধ করা যেতে পারে? এর উত্তরটা আসলে অপ্রত্যাশিতভাবে পাওয়া গিয়েছিল।

Dental Times

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোতে বেশ অনেক বছর ধরে দন্তচিকিৎসকরা মনে মনে চিন্তা করছিল যে, সেখানকার অনেক লোকের কেন দাগযুক্ত দাঁত রয়েছে। অবশেষে জানা যায় যে, জলে মাত্রাতিরিক্ত ফ্লোরাইড থাকার কারণে এমনটা হয়েছে। কিন্তু, স্থানীয় এই সমস্যার বিষয় নিয়ে গবেষণা করার সময় গবেষকরা অপ্রত্যাশিতভাবে এক আবিষ্কার করেছিল, দাঁত ব্যথা প্রতিরোধের জন্য পৃথিবীব্যাপী যে-বিষয়টার গুরুত্ব ছিল: যেসব জায়গার খাবার জলে অপর্যাপ্ত মাত্রায় ফ্লোরাইড রয়েছে, সেখানে যে-লোকেরা বড় হয়ে উঠেছে, তাদের দন্তক্ষয় বেশি হয়েছে। ফ্লোরাইড হচ্ছে দাঁতের ইনামেলের (দাঁতের শক্ত বহিরাবরণ) একটা উপাদান, যা অনেক জায়গার জল সরবরাহে প্রকৃতিগতভাবেই থাকে। যে-লোকেদের জল সরবরাহে ফ্লোরাইডের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণে ফ্লোরাইড সরবরাহ করা হলে, দাঁতের ক্ষয়ের প্রকোপ অন্তত ৬৫ শতাংশ কমে যায়।

এভাবে সেই রহস্যের সমাধান হয়েছিল। দন্তক্ষয়ের কারণেই অধিকাংশ দাঁত ব্যথা হয়। চিনি দন্তক্ষয়ের কারণ। ফ্লোরাইড এর প্রতিরোধে সাহায্য করে। অবশ্য, এটা ভালভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, ফ্লোরাইড কখনোই পর্যাপ্ত ব্রাশ ও ফ্লস করার বিকল্প হতে পারে না।

Dental Times

চেতনানাশক পদার্থ আবিষ্কারের আগে, দন্তচিকিৎসার প্রক্রিয়া রোগীদের জন্য নিদারুণ যন্ত্রণা সৃষ্টি করত দন্তচিকিৎসকরা ধারালো যন্ত্রপাতি দিয়ে দূর্বল, ক্ষয়প্রাপ্ত দাঁত তুলে ফেলত আর এরপর গর্তটা ভরাট করার জন্য সেখানে উত্তপ্ত গলিত ধাতু ঢেলে দেওয়া হতো। যেহেতু তাদের কাছে অন্য ধরনের কোনো চিকিৎসা ছিল না, তাই তারা যে-দাঁতের আভ্যন্তরীণ তন্তু (পাল্প) সংক্রামিত হয়েছিল, সেখানকার কোষগুলোকে নষ্ট করার জন্য রুট ক্যানেলের মধ্যে একটা জ্বলন্ত গরম লোহার শলাকা ঢুকিয়ে দিত। বিশেষ যন্ত্রপাতি ও চেতনানাশক পদার্থ আবিষ্কারের আগে দাঁত টেনে তোলাও এক চরম অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা ছিল। দাঁত ব্যথা অত্যন্ত কষ্টদায়ক বলে লোকেরা এই ধরনের এক অত্যাচারকে মুখ বুজে সহ্য করত। যদিও বিভিন্ন ভেষজ উপাদান যেমন আফিম, ভাং এবং নিদ্রা উদ্রেককারী গাছের নির্যাস শত শত বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে কিন্তু এগুলো কোনোভাবেই ব্যথার তীব্রতা কমাতে পারেনি। তা হলে, দন্তচিকিৎসকরা কি কখনো ব্যথাহীন অপারেশন করতে সক্ষম হবে?

ইংরেজ রসায়নবিদ জোসেফ প্রিস্টলি যখন ১৭৭২ সালে প্রথম নাইট্রাস অক্সাইড বা লাফিং গ্যাস প্রস্তুত করেন। তার কিছু পরেই এটার চেতনানাশক বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়েছিল। কিন্তু, ১৮৪৪ সালের আগে পর্যন্ত কেউই এটাকে এক চেতনানাশক পদার্থ হিসেবে ব্যবহার করেনি। সেই বছরের ১০ই ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটের হার্টফোর্ডে হরেস ওয়েলস নামে একজন দন্তচিকিৎসক এমন একটা বক্তৃতায় যোগ দিয়েছিলেন, যেখানে লোকেদের লাফিং গ্যাসের সাহায্যে আনন্দদান করা হয়েছিল। ওয়েলস লক্ষ করেছিলেন যে, এই গ্যাসের প্রভাবে একজন ব্যক্তি একটা ভারী বেঞ্চে তার পা ঘষেও ব্যথার কোনো লক্ষণ প্রকাশ করেননি। ওয়েলস একজন সহানুভূতিশীল ব্যক্তি ছিলেন আর দাঁতের চিকিৎসার সময় তার রোগীদের তিনি যে-ব্যথা দিতেন, সেই কারণে নিজে বেশ অস্বস্তি বোধ করতেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে এই গ্যাসকে চেতনানাশক পদার্থ হিসেবে ব্যবহার করার বিষয় চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু, এটা অন্যের ওপর প্রয়োগ করার আগে, তিনি নিজের ওপর প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ঠিক পরদিনই তিনি তার নিজের সেই বিশেষ চেয়ারে বসেন এবং অচেতন না হওয়া পর্যন্ত তার শ্বাসের সঙ্গে সেই গ্যাস গ্রহণ করেছিলেন। এরপর একজন সহকর্মী তার আক্কেল দাঁত তুলে ফেলেছিলেন। এটা ছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা। অবশেষে, ব্যথাহীন দন্তচিকিৎসা সম্ভব হয়েছিল!

সেই সময়ের পর থেকে দন্তচিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত অনেক উন্নতি ঘটেছে। তাই, আপনি দেখতে পাবেন যে, আজকে দন্তচিকিৎসকের কাছে যাওয়া বেশ আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতাই হবে।

Continue Reading

ফিচার

খুনের রহস্য যখন সমাধান করল ডেন্টিস্ট্রি

Published

on

১৯৬৭ সালের ৭ আগস্ট সকালবেলা, স্কটল্যান্ডের একটি ছোট শহরবাসীর ঘুম ভাংগল ১৫ বছরের একটি মেয়ের লাশ উদ্ধার হওয়ার খবরে।মেয়েটির নাম লিন্ডা,লিন্ডাকে খুব নির্মমভাবে পেটানো হয়েছে।এছাড়াও তার বুকের ডানদিকে রয়েছে কামড়ের চিহ্ন।খুনী আর কোন ক্লু রেখে যায় নি।এই কেসটি সমাধান করেছিলেন ডাঃ ওয়ারেন হার্ভে।এটিই বৃটেনের প্রথম কেস যেটি সমাধানে সম্পূর্নভাবে ফরেনসিক ওডোন্টোলজির উপর নির্ভর করে রায় দেয়া হয়েছিল।

কেসের আগে এর সমাধানকারী ডাঃ ওয়ারেন হার্ভে সম্পর্কে কিছু বলা যাক।ডাঃ হার্ভে ১৯১৪ সালে স্ট্রাটফোর্ডশায়ারে জন্মগ্রহণ করেন।তার পিতাও ছিলেন একজন ডাক্তার।স্রেসবুরীতে প্রাথমিক লেখাপড়া শেষে গাইস হাসপাতাল থেকে ডেন্টাল ডিগ্রী অর্জন করেন।।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ডেন্টাল অফিসার হিসাবে যোগ দেন।যুদ্ধ শেষে রয়্যাল ম্যাসনিক হাসপাতালে কাজ করেন।১৯৬২ সালে তিনি গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গ্লাসগো হাসপাতালের কনসালটেন্ট হিসাবে যোগ দেন।

গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার সময় তিনি কেসটি সমাধানের দায়িত্ব পান।কেসটিকে বিচারকরা যথেষ্ট গুরত্বের সাথে নিয়েছিলেন,কিন্তু উপযুক্ত ক্লু এর অভাবে পুলিশ ও মামলাটির কূলকিনারা পাচ্ছিলেন না।এই দিকে মিডিয়া এবং জনগন ও ধৈর্য্যহারা হয়ে যাচ্ছিল।অনেক চাপের মুখেই ডাঃ হার্ভে দায়িত্ব নেন।

আশ্চর্যজনকভাবে বাইট মার্ক ছাড়া ধর্ষণের কোন আলামত ও পাওয়া যায় নি।যে জায়গায় কামড়ের চিহ্ন পাওয়া গেসে সেখানে কখনোই লিন্ডার নিজের পক্ষে কামড়ানো সম্ভব না।এই চিহ্ন যে খুনীর ছাড়া অন্য কারো হতে পারে না এই বিষয়েও কোন সন্দেহ ছিল না।

সন্দেহভাজন ২৯ জনের ইম্প্রেশন নেয়া হয়। সেখান থেকে ৫ জনকে আলাদা করে হয়।কিন্তু ৫ জনের বাইট মার্ক এত কাছাকাছি যে আলাদাভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছিল না।প্রযুক্তিও তখন এতটা অগ্রসর হয় নি।

হার্ভে খেয়াল করলেন বাইটমার্কে উপরের ডানচোয়ালের সেন্ট্রাল ইনসিসরের চিহ্ন ঠিক স্বাভাবিক না।এই অস্বাভাবিকতাই মামলার সকল জট খুলে দিল।তিনি আবার ইম্প্রেশন নেওয়ালেন,লিন্ডার ঘনিষ্ঠ বন্ধু গর্ডনের দাঁতের সাথে তা হুবহু মিলে যায়। হার্ভের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ গর্ডনকে গ্রেফতার করে।

গর্ডনের সেন্ট্রাল ইনসিসরে ম্যালডেভেলপমেন্টের কারনে একটি অতিরিক্ত অংশ বা কাসপ দেখা যায়।ডেন্টিস্ট্রিতে যাকে বলা হয় ট্যালন কাসপ।ট্যালন কাসপের জন্য লিন্ডার শরীরে কামড়ের কালশিটে জায়গায় স্বাভাবিকের বদলে কিছুটা গোলাকৃতি ছাপ দেখা যায়।এই ছাপই গর্ডনকে ধরিয়ে দেয়।

Dental Times

ডাঃ হার্ভে ৪০০ ঘন্টা গবেষণা করে প্রতিবেদন দাখিল করেন।পুলিশে জিজ্ঞাসাবাদে গর্ডন তার দোষ স্বীকার করে নেয়।লিন্ডা তার সাথে সম্পর্কে প্রতারণার জের ধরে এই হত্যাকান্ড ঘটায় বলে জানায়।

আড়াই ঘন্টা শুনানি শেষে বিচারকরা গর্ডনকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেয় কিন্তু ১৮ বছর না হওয়ায় তাকে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়।

বৃটেনে এর আগে আদালতে ফরেনসিক ডেন্টিস্ট্রিকে আমলে নিলেও সেবারই প্রথম যখন শুধুমাত্র ডেন্টাল এভিডেন্সের ভিত্তিতে মামলার রায় দেয়া হয়।

এই রায়ের পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আদালতে ফরেনসিক ডেন্টিস্ট্রির কদর বেড়ে যায়।ডাঃ হার্ভে তার মৃত্যুর মাত্র দুই সপ্তাহ পূর্বে ১৯৭৪ সালে তার বহুল প্রতীক্ষীত Dental Identification and Forensic Odontology বইটি প্রকাশ করনে। এই বইটিকে অনেকে ফরেনসিক ডেন্টিস্ট্রির বাইবেল হিসাবে মনে করে।

ডাঃ হার্ভের একটি উক্তি –

“The law must keep pace with science…it usually lags a little behind but it does progress as scientific knowledge itself advances.”

তথ্য সংগ্রহে:
Dental Times

শাহ সাইফ জাহান
ঢাকা ডেন্টাল কলেজ

Continue Reading

ফিচার

ডেন্টাল চিকিৎসা নিবেন?

Published

on

ডাঃ মোঃ আরিফুর রহমান

আমাদের অনেকেই দাঁতের যন্ত্রণায় দন্ত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই। অন্য সব শল্যচিকিৎসার মত দন্ত চিকিৎসায় কিছু কিছু আচার ব্যাবহার মেনে চলা উচিত, এতে চিকিৎসক ও রোগী উভয়েই উপকৃত হবেন।

আমাদের চারিদিকে অনেক ভেজালের ভিড়ে ভেজাল ডাক্তারও কিন্তু আছে। দাঁতের ডাক্তার নির্বাচনের সময় খেয়াল রাখবেন যেন চিকিৎসক অবশ্যই ন্যূনতম বিডিএস (Bachelor of Dental Surgery) ডিগ্রিধারী হন। মনে রাখবেন বিডিএস ডিগ্রী এবং বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) এর অনুমোদন ছাড়া কেউ দাঁত ও মুখের চিকিৎসা করার যোগ্যতা রাখে না।একজন বিডিএস ডিগ্রিধারী ডাক্তার বিএমডিসির নীতিমালা অনুযায়ী নিজের রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্রেসক্রিপশন প্যাড এ লিখে থাকেন যেটা আপনি বিএমডিসির ওয়েবসাইটে গিয়ে যাচাই করে দেখতে পারবেন।

ধৈর্য্য হারাবেন না

ডেণ্টাল ক্লিনিকে রোগীদের একটু বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় কারন ডেন্টাল সার্জনদের ক্ষেত্রে মেডিসিন এর চিকিৎসকদের মত শুধু রোগ পরীক্ষা করে ওষুধ লিখে দিয়ে কাজ শেষ হয়না বরং পুরাতন রোগী ছাড়াও ক্ষেত্রবিশেষে নতুন রোগীর সার্জারি সহ অনন্য প্রসিডিওর করতে হয়, যা সময় সাপেক্ষ। সুতরাং দেখা যায় এক এক জন রোগীর পেছনে ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘন্টা

সময় চলে যায়। তাই অপেক্ষার পালা দীর্ঘ হলে ধৈয্য হারাবেন না। মনে রাখবেন আপনার জন্যও এমন সময় দেয়া হবে। অধিকাংশ ব্যস্ত ডাক্তার রোগীদের জন্য টেলিফোনে অগ্রীম সিরিয়াল নেবার ব্যবস্থা রাখেন। সেইসময় সাধারণত একটা অনুমানিক সময় দেয়া হয়। অপেক্ষাকালীন সময় জরুরী রোগী (দুর্ঘটনায় আঘাতপ্রাপ্ত বা মাত্রারিক্ত যন্ত্রণায় অস্থির) থাকলে মানবিকতার খাতিরে আগে যেতে দিন।

ডাক্তারের সামনে

আপনি যদি নতুন রোগী হউন তবে ডাক্তার আপনার দাঁতের অসুবিধার কথা জানতে চাইবেন। এইক্ষেত্রে অল্প কথায় আপনার মূল অসুবিধা কি কি জানাবেন। যেমন- ‘নীচের চোয়ালের বাম দিকে ব্যাথা’ অথবা ‘দাঁত এ শিরশির করে’। মনে রাখবেন অতিরিক্ত সমস্যার কথা বললে যেমন রোগ নির্ণয় করা কঠিন হয় তেমনি একদম কম কথাতেও মূল সমস্যার কাছাকাছি যাওয়া কঠিন হতে পারে । দাঁতের রোগের পাশাপাশি আপনার  অন্য কোন রোগ থাকলে তা ডাক্তারকে জানাতে ভুলবেন না।Dental Timesআপনি যদি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রিউমেটিক ফিভার বা অন্য কোন রোগের জন্য ঔষধ খাওয়ারত থাকেন তবে সেই প্রেসক্রিপশন দেখান। বিশেষকরে আপনি যদি গর্ভবতী হয়ে থাকেন বা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান এই তথ্যগুলোও আপনার ডেন্টাল সার্জনকে নিঃসংকোচে জানাবেন কারন গর্ভকালীন সময় অনেক ওষুধ (বিশেষ করে ব্যাথার ওষুধ) দেয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকে।

সাজসজ্জা

লিপস্টিকে হয়ত আপনাকে সুন্দর দেখায় কিন্তু দাঁতের ডাক্তারের কাছে যাবার আগে লিপস্টিক মুছে নিন কারন তা চিকিৎসা প্রক্রিয়ার সময় নষ্ট তো হবেই পাশাপাশি ডাক্তারের গ্লাভস ও যন্ত্রপাতিতে লেগে যাওয়া লিপস্টিক বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের বিরক্তির কারন হতে পারে । Dental Timesঅনেক মহিলা মাথার চুল উচু করে খোঁপা করে রাখেন যা ডেন্টাল চেয়ারে মাথা রাখার ক্ষেত্রে অসুবিধার সৃষ্টি করে এবং উপরের পাটির দাঁতের সুক্ষ চিকিৎসা (যেমন রুটকেনেল বা ফিলিং) করার সময় ডাক্তারের সমস্যা হয়। তাই চুল উঁচু করে খোঁপা না করাই শ্রেয়।

আপনার কমনসেন্স ব্যবহার করুন

ডাক্তারের রুমে ঢুকবার সময় আপনার সাথে থাকা মোবাইল ফোন সাইলেন্ট করে নিন। চিকিৎসা চলাকালীন সময় রিং বাজলে এবং মোবাইল ব্যবহার করলে চিকিৎসা প্রক্রিয়াতে বাধা পড়ে এবং ডাক্তারের বিরক্তির সৃষ্টি করতে পারে।

ডেন্টাল ক্লিনিকগুলোর ভিতরে ওটি রুম জীবাণুমুক্ত রাখার জন্য অনেক ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয় এবং অধিকাংশ ক্লিনিকের এই অংশে জুতা খুলে প্রবেশ করার নিয়ম। সাধারণত ক্লিনিকগুলোতে ভেতরে পরার জন্য আলাদা জুতা থাকে, সেটা চেয়ে নিন। মনে রাখবেন এই নিয়মগুলো আপনার জীবাণুমুক্ত পরিবেশে চিকিৎসা সেবা  নিশ্চিন্ত করার উদ্দেশেই করা। আপনাকে দাঁতের ডাক্তারের কাছে আসার আগে দাঁত ব্রাশ করে আসতে হবে এমন কোন কথা নাই কিন্তু অন্তত মুখে একগাদা পান বা ওয়েটিং রুমে চিবুনো চিপস এর কণা মুখে নিয়ে দাঁত এর চিকিৎসকের কাছে মুখ হা করা উচিত নয়।এই ক্ষেত্রে অন্তত ডেন্টাল চেয়ারে বসে প্রথমেই পানি দিয়ে ভাল মত কুলি করে নিতে পারেন।

ডেন্টাল ক্লিনিক মাছ বাজার নয়

আপনার দাঁতের সমস্যা পরীক্ষা করার পরে ডাক্তার সাধারণত আপনার কি কি অসুবিধা তা ব্রিফ করেন এবং এর সমাধানের যেসব রাস্তা আছে তা বর্ণনা করেন। অধিকাংশ ডাক্তার আপনাকে এই সময় খরচের হিসাব দিয়ে দিবেন। অনেক রোগী খরচের কথা শুনেই দামাদামি শুরু করেন, অনেকে আবার অন্য ডাক্তারের উদাহরণ টানেন। যাই হোক আপনাকে এই ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে ডেন্টাল ক্লিনিক মাছের বাজার না। অধিকাংশ ক্লিনিকের দৃষ্টিগোচর স্থানে বিভিন্ন কাজের চার্জ এর তালিকা দেয়া থাকে। যদি আপনাকে ডাক্তার খরচ এর হিসেব না দেন তবে নিজে থেকেই জেনে নেয়া ভাল, বিশেষ করে কিরকম কি খরচ হবে, কয় দিন আসতে হবে ইত্যাদি। এতে পরবর্তীতে ভুল বুঝাবুঝির অবকাশ থাকবে না। মনে রাখবেন দাঁতের চিকিৎসায় যে সব যন্ত্রপাতি আর মেটেরিয়ালস ব্যবহার হয় সেগুলো অধিকাংশ বিদেশ থেকে আমদানী করা হয় তাই স্বাভাবিকভাবেই এই চিকিৎসা একটু ব্যায়বহূল।

তবে প্রতিটা সমস্যার কয়েক ধরনের সমাধান থাকে। তাই আপনার আর্থিক অবস্থা যেমনি হোক না কেন সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য সাধ্য অনুযায়ী একটা না একটা পথ আপনি বেছে নিতে পারবেন। যেমন আপনি যদি একটা দাঁত বাধানোর উদ্দেশে যদি ডাক্তারের কাছে যান তবে তার  তিন ধরনের উপায় আছে, ব্রিজ করতে চাইলে একটা দাঁতের পিছনে ন্যূনতম ১৫-২০ হাজার টাকা খরচ হয়ে থাকে কিন্তু এই দাঁত বাধানোর অন্য পদ্ধতি পারশিয়াল ডেনচার করলে মাত্র ৮০০-১৫০০ টাকায় করা সম্ভব। আবার এই দাঁত লাগানোরই সর্বাধুনিক পদ্ধতি ইমপ্ল্যান্ট করতে চাইলে আপনাকে এই এক দাঁতের জন্যই গুনতে হবে অন্তত ৪০-৬০ হাজার টাকা। তাই আপনার সাধ্য অনুসারে চিকিৎসা নিন। একান্তই গরীব রোগীদের জন্য মানবিকতার খাতিরে ডাক্তাররা সাধারণত একটু ছাড় দিয়ে থাকেন । সেক্ষেত্রে আপনার আর্থিক অসুবিধার কথা বিনীত ভাবে জানান।

দাঁতের ডাক্তার ভীতি

অনেক রোগী চিকিৎসা করাতে খুব ভয় পান। দাঁত অনেক সংবেদনশীল অঙ্গ। দাঁতের মধ্যে ড্রিল করা বা মুখের ভেতরে ইনজেকশন দেবার সময় অনেক রোগী ভয় পেয়ে থাকেন। অনেকে ভয়ের কারনে অস্থির হয়ে পরেন, এতে চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। জেনে রাখা ভাল যে আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং নতুন নতুন পদ্ধতি সংযোজনের মাধ্যমে বর্তমানে দাঁতের চিকিৎসা বলতে গেলে একদম বিনা ব্যাথায় দেয়া সম্ভব। আপনার ডেন্টাল ফোবিয়া থাকলে ডাক্তারকে জানান। ডেন্টাল চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই ৩-৪ বার সিটিং দেয়া লাগে এবং এর মাধ্যমে চিকিৎসক এর সাথে রোগী এবং রোগীর পরিবারের একটা বন্ধন গড়ে উঠে। তাহলে আর দেরী কেন? দাঁতের যন্ত্রনা সহ্য করে যারা দিন কাটাচ্ছেন তারা সকল দ্বিধা আর ভীতি উপেক্ষা করে আজই একজন বিডিএস ডিগ্রীধারী ডাক্তারের শরণাপন্ন হউন।

ডাঃ মোঃ আরিফুর রহমান
বিডিএস, এমপিএইচ
সহকারী অধ্যাপক ও ডেন্টাল ইউনিট প্রধান
নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ , সিলেট।

Continue Reading
Dental Times
জাতীয়47 mins ago

‘ওমিক্রন’ কেন বিপজ্জনক? এর উপসর্গ কী কী?

Dental Times
করোনা পরিস্থিতি1 hour ago

ওমিক্রন ঠেকাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৫ দফা নির্দেশনা

Dental Times
জাতীয়14 hours ago

সরকারি ডেন্টালে ৪৭ আসন ফাঁকা

Dental Times
আন্তর্জাতিক4 days ago

মিয়ানমারে ১৪ চিকিৎসাকর্মী গ্রেপ্তার

Dental Times
ছবি ও গল্প6 days ago

অভিনেত্রী ডাঃ বাঁধনকে নিয়ে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ দেখলেন ডেন্টাল সার্জনবৃন্দ

Dental Times
শিক্ষাঙ্গন6 days ago

সিআইএমসিতে বিশ্ব অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল সচেতনতা সপ্তাহ পালন

Dental Times
জাতীয়6 days ago

আপিল নিষ্পত্তির আগে ডেন্টাল টেকনোলজিস্টদের প্রাকটিসের অনুমতি না দেওয়ার অনুরোধ

Dental Times
ফিচার1 week ago

ন্যানো ডেন্টিস্ট্রি

Dental Times
জাতীয়2 weeks ago

ভয়াবহ শিক্ষক সংকটে শেবামেক ডেন্টাল ইউনিট: ৩৮ পদে কর্মরত ৬

Dental Times
করোনা পরিস্থিতি3 weeks ago

মলনুপিরাভিরঃ কোভিডের ১ম মুখে খাওয়ার ঔষধ এখন বাংলাদেশে

চট্টগ্রামে পুর্ণাঙ্গ ডেন্টাল কলেজ স্থাপনের জন্য জমি পরিদর্শন
জাতীয়3 weeks ago

চট্টগ্রামে পুর্ণাঙ্গ ডেন্টাল কলেজ স্থাপনের জন্য জমি পরিদর্শন

Dental Times
Campus News4 weeks ago

দুই দিন ব্যাপী সিডিসি এলামনাই এর ওয়েবসাইট উদ্বোধন ও সেমিনার আয়োজিত

Dental Times
জাতীয়1 month ago

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ১৭ নথি গায়েব, শাহবাগ থানায় জিডি

ডেন্টাল কলেজে ভর্তির আশ্বাসে প্রতারণা
জাতীয়1 month ago

ডেন্টাল কলেজে ভর্তির আশ্বাসে প্রতারণা, জবি ছাত্র গ্রেপ্তার

Dental Times
জাতীয়1 month ago

১১টি খাতে দুর্নীতির মহোৎসব স্বাস্থ্যখাতে

Dental Times
জাতীয়1 month ago

সেনাবাহিনীর দুই ডেন্টাল সেন্টারের পতাকা উত্তোলন

Dental Times
জাতীয়1 month ago

বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন পূর্বক ডেন্টিস্টরা যে কোথাও প্র্যাক্টিস করতে পারবে

Dental Times
জাতীয়2 months ago

স্কুলশিক্ষার্থীদের পরীক্ষামূলক করোনার টিকা দেওয়া শুরু

Dental Times
আন্তর্জাতিক2 months ago

উহানবাসীর রক্তের নমুনা পরীক্ষা করবে চীন

Dental Times
আন্তর্জাতিক2 months ago

করোনার উৎস সন্ধানে ‘শেষ সুযোগ’ ডব্লিউএইচওর

Advertisement

সম-সাময়িক

Subscribe for notification