মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম. আবদুল্লাহ’র অধ্যাপক এমিরেটাস নিয়োগ বাতিল নিয়ে সমালোচনার পর এর ব্যাখায় বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) বলেছে, নিয়োগটি ‘বিধি বহির্ভূত’ হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ডা. মো. মোস্তফা কামাল সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক আবদুল্লাহ’র নিয়োগ বাতিল করার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বর্তমান সিন্ডিকেন্ডের সিদ্ধান্তের আলোকে তার আজীবন এমিরেটাস অধ্যাপক বাতিল করার কথা বলা হয়।
একই সঙ্গে দুই বছর ধরে বাড়তি বেতন-ভাতা নেওয়ায় ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদী ও পুনরাবৃত্ত’ আর্থিক দায় সৃষ্টি হয়েছে বলে পর্যালোচনায় দেখতে পেয়েছে বর্তমান প্রশাসন বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
এ পর্যন্ত তিনি এ খাতে সাড়ে ১৪ লাখ টাকারও অধিক অর্থ গ্রহণ করেছেন বলে এতে তুলে ধরা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “এই নিয়োগের পর গত প্রায় দুই বছর তিনি (অধ্যাপক আবদুল্লাহ) নিয়মিত কর্মস্থলে আসেননি, শিক্ষাদান করেননি, কোনো গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন কি না- প্রশাসনকেও অবহিত করেননি; কিন্তু ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন।”
বিএমইউ গত বুধবার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সাবেক ডিন এবিএম আবদুল্লাহ’র আজীবন এমিরেটাস অধ্যাপকের নিয়োগ বাতিল করে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুনের পর থেকে নেওয়া তার বেতন-ভাতাদি ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
এ নিয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক আবদুল্লাহ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে সেদিন বলেন, “প্রতিহিংসা থেকে আমার নিয়োগ তারা বাতিল করেছে। এটা আজীবনই হয়, তারা এমন করতে পারে না। তারা বেতন ফেরত চেয়ে সবচেয়ে নিচু মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে।”
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এ চিকিৎসকের নিয়োগ বাতিলের পর এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনার পর শনিবার এর দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেয় বিএমইউ।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “এই সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে গৃহীত নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে। নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায় যে এই নিয়োগকে ঘিরে একাধিক প্রক্রিয়াগত, প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করেছে।”
বিজ্ঞপ্তিতে অধ্যাপক আবদুল্লাহকে এমিরেটাস অধ্যাপক ও আজীবন এমিরেটাস অধ্যাপক করার আগের সিদ্ধান্ত ও অফিস আদেশের বিস্তারিত তুলে ধরে বলা হয়, ৬৬তম একাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশ এবং ৮৫তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক আবদুল্লাহকে তিন বছরের জন্য এমিরেটাস অধ্যাপক করা হয়। তখন মাসিক ৩০ হাজার টাকা সম্মানী, চিকিৎসা সুবিধা এবং সীমিত প্রশাসনিক সুবিধা প্রদান করা হয়।
“ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক দায় ছিল সীমিত এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে আবদ্ধ। উক্ত নিয়োগ বিধি মোতাবেক হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং সিন্ডিকেট এই নিয়োগ নিয়ে কোনো আপত্তি করেনি।”
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এর দুই বছর পর তার এ নিয়োগের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ছয় মাস আগে ২০২৪ সালের ২০ জুন সিন্ডিকেটের ৯২তম সভায় ‘প্রফেসর এমিরেটাস অধ্যাদেশ’ সংশোধনের মাধ্যমে প্রফেসর এমিরেটাস পদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আজীবন নিয়োগের বিধানসহ আর্থিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়। তখন মাসিক সম্মানী নির্ধারণ করা হয় অধ্যাপক হিসাবে তার অবসরে যাবার সময়কার ভাতার সমান। এর পাশাপাশি তিনি আজীবন চিকিৎসা সুবিধা, স্টাফসহ অফিস ও অন্যান্য সুবিধা পাবেন।
“সিন্ডিকেটের বাজেট অধিবেশনে মূল এজেন্ডার বাইরে এই ধরনের প্রস্তাব উত্থাপন নজিরবিহীন ও বেআইনি। এতে প্রতীয়মান হয় যে এই নিয়োগ তড়িঘড়ি বিবেচনার মাধ্যমে একজনকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। এ পর্যন্ত তিনি এই খাতে আনুমানিক সাড়ে ১৪ লক্ষ টাকারও অধিক অর্থ গ্রহণ করেছেন।”
বিজ্ঞপ্তিতে যে প্রক্রিয়ায় অধ্যাপক আবদুল্লাহকে আজীবন এমিরেটাস করা হয়েছে তাতে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
এতে বলা হয়, “বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকস এমিরেটাস পদে নিয়োগের নজির রয়েছে। তবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কোনো অধ্যাপক এমিরেটাসকে আজীবনের জন্য পূর্ণকালীন অধ্যাপকের সর্বোচ্চ বেতনের সমপরিমাণ পারিশ্রমিক এবং এ ধরনের বিস্তৃত আর্থিক ও প্রশাসনিক সুবিধা প্রদানের নজির পাওয়া যায় না। বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়টি পর্যালোচনাকালে দেখতে পায় যে, এই ব্যবস্থার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও পুনরাবৃত্ত আর্থিক দায় সৃষ্টি হয়েছে।”
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মনে করে, বেআইনিভাবে এজেন্ডার বাইরে প্রস্তাব উত্থাপন করে, কোনো অধ্যাদেশ সংশোধনের পর একই সভায় সেই সংশোধিত বিধানের সুবিধা তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োগ করা প্রশাসনিক ও আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিতর্কিত এবং এ ধরনের পদক্ষেপ প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে।”
এসব কারণে বর্তমান সিন্ডিকেট সব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে অধ্যাপক আবদুল্লাহকে আজীবন এমিরেটাস করার সিদ্ধান্ত ‘বিধি বহির্ভূত বিবেচনায়’ বাতিল করতে বাধ্য হয় বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
অপরদিকে বেতন-ভাতা ফেরত চাওয়ার ব্যাখ্যায় বলেছে, “বিধি অনুযায়ী যদি কোনো নিয়োগ পরবর্তীকালে প্রক্রিয়াগত বা আইনগত ত্রুটির কারণে বাতিল বা অকার্যকর বলে বিবেচিত হয়, তাহলে সেই নিয়োগের ভিত্তিতে দেওয়া আর্থিক সুবিধাও পুনরুদ্ধারের বাধ্যবাধকতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের রয়েছে।”
এটি প্রচলিত আইনের বিধান; কাউকে হয়রানি করা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য নয় বলে দাবি করা হয়েছে।
