তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে নতুন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি ২৪ হাজার ৭২৭টি চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ১১ হাজার ৬৩২টি আসবাবপত্র কেনার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ডেন্টাল শিক্ষা ও রোগীসেবার মান উন্নত করা যায়।
দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ সরকারি ডেন্টাল কলেজ ঢাকা ডেন্টাল কলেজের দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট, শ্রেণিকক্ষের ঘাটতি এবং শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নে ৫৪৭ কোটি ২৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্প নিয়েছে সরকার।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তুলে স্নাতক শিক্ষার্থী, স্নাতকোত্তর চিকিৎসক ও শিক্ষকদের জন্য উন্নত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা, ডেন্টাল শিক্ষার পরিধি বাড়ানো এবং মানসম্মত মুখ ও দাঁতের চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ করা হবে।
তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে নতুন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি ২৪ হাজার ৭২৭টি চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ১১ হাজার ৬৩২টি আসবাবপত্র কেনার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ডেন্টাল শিক্ষা ও রোগীসেবার মান উন্নত করা যায়।
‘ঢাকা ডেন্টাল কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। প্রকল্পটির পৃষ্ঠপোষক মন্ত্রণালয় হবে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ।
প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। ২৬ জুলাই প্রকল্প প্রস্তাবের ওপর পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হওয়ার কথা রয়েছে। ওই আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সুপারিশ পেলে প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে বলে পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
চাহিদার তুলনায় পিছিয়ে অবকাঠামো
১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা ডেন্টাল কলেজ ২০০০ সালে মিরপুর-১৪ ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়। তবে শিক্ষার্থী সংখ্যা বৃদ্ধি এবং আধুনিক ডেন্টাল শিক্ষার চাহিদা বাড়লেও সে অনুযায়ী অবকাঠামোর সম্প্রসারণ হয়নি।
কলেজটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শিক্ষার্থীদের জন্য তীব্র আবাসন সংকট রয়েছে। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গ্যালারি শ্রেণিকক্ষ ও টিউটোরিয়াল রুমও নেই। ফলে শিক্ষার্থী ভর্তি বাড়লেও শ্রেণিকক্ষ ও একাডেমিক সুবিধার অভাবে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
এ সংকট কাটাতে প্রকল্পের আওতায় মিরপুর ক্যাম্পাসে নতুন একাডেমিক ভবন, ১০ তলাবিশিষ্ট পৃথক ছাত্র ও ছাত্রী হোস্টেল, অধ্যক্ষের বাসভবন এবং স্নাতকোত্তর চিকিৎসক ও শিক্ষকদের জন্য একটি বহুমুখী ভবন নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া সোবহানবাগ ক্যাম্পাসের পুরোনো একটি ভবনের জায়গায় বহুমুখী ভবনটি নির্মাণ করা হবে।
‘অবকাঠামো উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি’
ঢাকা ডেন্টাল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক হুমায়ুন কবির বলেন, আন্তর্জাতিক মানের ডেন্টাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে কলেজটির অবকাঠামো, একাডেমিক সুবিধা, গবেষণা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে কলেজটিতে প্রায় ৭০০ শিক্ষার্থী রয়েছেন। প্রতি বছর প্রায় ১১০ জন দেশীয় ও ২৫ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হন। কিন্তু শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়নি।
তিনি আরও বলেন, ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠার পর আজও এটি দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ সরকারি ডেন্টাল কলেজ। আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, চিকিৎসাসেবা ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
অধ্যাপক হুমায়ুন কবির বলেন, “প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চিকিৎসক ও রোগী—সবাই উপকৃত হবেন। বর্তমানে কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের জন্যও পর্যাপ্ত আবাসনের ব্যবস্থা নেই। নতুন ভবন ও হোস্টেল নির্মাণ হলে এ সংকট অনেকটাই দূর হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক মানের ডেন্টাল শিক্ষা, চিকিৎসা ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে।”
প্রকল্প নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের প্রশ্ন
প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার কার্যপত্রে প্রকল্পটির বিভিন্ন ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
কমিশন ১৯২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয়ে অনাবাসিক ভবন, ১৮৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয়ে আবাসিক ভবন এবং বৈদ্যুতিক কাজে ১০৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ের যৌক্তিকতা জানতে চেয়েছে। এছাড়া লিফট, আসবাবপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ব্যয়েরও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
কমিশন আরও জানতে চেয়েছে, ১০ তলাবিশিষ্ট ছাত্র হোস্টেলে ৭৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং ছাত্রী হোস্টেলে ১০৯ কোটি টাকা ব্যয়ের যৌক্তিকতা কী এবং এসব হোস্টেল নির্মাণের মাধ্যমে আবাসন সংকট পুরোপুরি দূর হবে কি না।
এ ছাড়া বহুমুখী ভবন ও অধ্যক্ষের বাসভবনে কী কী সুবিধা থাকবে, প্রকল্পটির সম্ভাব্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগের বিপরীতে সম্ভাব্য লাভ, সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণের বিষয় এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রকাশ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়েও ব্যাখ্যা চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
