চিকিৎসকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে যেন পেশাগত দায়িত্ব বিঘ্নিত না হয়, সেজন্য সতর্ক থাকতে ড্যাব সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, “শিক্ষার্থী কিংবা পেশাজীবীগণ রাজনীতিতে সংশ্লিষ্ট থাকবেন কিংবা কতটা থাকবেন—এটা নিয়ে বিভিন্ন মহলে একটি আলোচনা আছে। এর পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত রয়েছে। তবে আমার মতটি আমি আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাই।
“সেটি হচ্ছে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেহেতু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রায় সকল কাজকে প্রভাবিত করে; সেহেতু শিক্ষার্থী-শিক্ষক কিংবা পেশাজীবী সবাই যার যার মতাদর্শ অনুসারে রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত থাকবেন বা সচেতন থাকবেন, এটা অযৌক্তিক কোনো বিষয় নয়।
“তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যেন নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন না ঘটায় বা বিঘ্ন ঘটার কারণ না হয়, সেটি হচ্ছে মোস্ট ইম্পোর্টেন্ট।”
শনিবার সকালে জাতীয় সংসদের এলডি হল প্রাঙ্গণে বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছিলেন তারেক রহমান। সংগঠনের ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “প্রথাগত রাজনীতির বাইরে এসে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন খুব সম্ভবত প্রত্যেকটি সেক্টরে সামগ্রিকভাবে সমগ্র বাংলাদেশ এখন সময়ের একটি কঠিন দাবি বা খুব স্ট্রং ডিমান্ড। আমরা সকলেই সেটি অনুভব করতে পারি; বিশেষ করে ৫ অগাস্টের পর থেকে।”
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স শত শয্যায় উন্নীতকরণ এবং হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “আমি দৃঢ়ভাবে ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, চিকিৎসকগণ যদি সেবার মানসিকতা নিয়ে নিজেদেরকে নিবেদিত না রাখেন; তাহলে এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে কিন্তু আমাদের সফলতা আসবে না।
“আমি জানি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আপনাদেরকে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়। তার পরও কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত অবহেলা বা দায়িত্ব পালনে শিথিল্য একদিকে সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, অপরদিকে চিকিৎসক কিংবা চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কেও জনমনে অনাস্থা তৈরি করে। এক্ষেত্রে দেশের মানুষ চিকিৎসকদের কাছ থেকে আরো দায়িত্বশীল এবং মানবিক ভূমিকা প্রত্যাশা করে।”
ড্যাব সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আসুন আমরা সকলে মিলে এমন একটি চিকিৎসা বান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষ সম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাবে এবং উন্নতি চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হবে না আর ইনশাল্লাহ।”
সমাবেশ শুরুর আগে সরকারপ্রধান তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান এলডি হল প্রাঙ্গণে দুটি বৃক্ষরোপণ করেন। এরপর জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়।
পরে সরকারপ্রধান তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমান কবুতর ও বেলুন উড়িয়ে চিকিৎসক সমাবেশের উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত: সংকট থেকে সমাধান’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডা. মোস্তফা আদিব সুমন এবং ‘জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উত্থান’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাইফ মোহাম্মদ।
‘দাবিগুলো অযৌক্তিক নয়’
স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থায় চিকিৎসক নিয়োগ, চিকিৎসকদের বয়সসীমা বাড়ানো, স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন প্রণয়নসহ বিভিন্ন দাবির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “আপনাদের অবস্থান থেকে যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে এই দাবিগুলো হয়তোবা খুব একটি অযৌক্তিক নয়।
“তবে এ ব্যাপারটিও কিন্তু আমাদের সকলের একটু বিবেচনা থাকা উচিত। সেটি হচ্ছে বর্তমান সরকার যখন দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে, আমরা একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র পেয়েছি বলা যায়; আমরা পেয়েছি—একটি দুর্বল অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন, ভঙ্গুর শিক্ষা বা ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা; সেই অবস্থা থেকে সরকার চেষ্টা করছে সমগ্র দেশকে সফলভাবে যাতে দাঁড় করাতে পারে।”
‘ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা বসে নেই’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “প্রশাসনে ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা কিন্তু বসে নেই। সাম্প্রতিক সময়ে আপনারা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, একটি চক্র খুব সুকৌশলে জ্বালানি কিংবা বিদ্যুৎ সেক্টরকে অস্থিতিশীল করার জন্য সক্রিয়। বেশ সক্রিয় তারা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর বক্তব্য উপস্থাপন করছে।
“সরকার কিন্তু একবারও অস্বীকার করেনি যে, বহু মানুষ- বাংলাদেশের বহু মানুষ এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংক্রান্ত বিষয়ে অনেক কষ্ট ভোগ করছে। আমরা জানি এটি। তবে আমি মাত্র উল্লেখ করেছি, আমরা সামগ্রিকভাবে একটি ভঙ্গুর অবস্থা বা ব্যবস্থা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি।
“গ্যাস বা জ্বালানি বা পেট্রোল সামগ্রিকভাবে জ্বালানি খাতে যেই অপরিকল্পিতভাবে প্ল্যান, প্রোগ্রামগুলো গ্রহণ করা হয়েছিল অথবা বিগত দিনগুলোতে কোনো নির্দিষ্ট মহলকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য যে সকল নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল; তার খেসারত সমগ্র দেশ দেশের মানুষ এবং বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে।”
তারেক রহমান বলেন, “এই অবস্থা থেকে উত্তরণে আমরা এর মধ্যে কাজ শুরু করেছি। আমরা কাজ করেছি যে, এই যে অপরিকল্পিত প্ল্যান যেগুলা ছিল, যা আমাদের জ্বালানি খাতকে একটি বিপদের মুখে ফেলে দিয়েছে, কীভাবে সেটিকে সঠিক করে নিয়ে আসতে পারি আমরা; কীভাবে এমন একটি পরিকল্পনা আমরা উপস্থাপন করতে পারি, যা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই পেট্রোল বলুন, গ্যাস বলুন বা সামগ্রিকভাবে জ্বালানি খাত বলুন—এর থেকে দেশ এবং দেশের মানুষকে ধীরে ধীরে আমরা সংকট থেকে ধীরে ধীরে আমরা বের করতে পারি, বের করে নিয়ে আসতে পারি।
“সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানিসহ প্রতিটি সেক্টরকে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং স্বনির্ভর করতে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নের কাজ এরই ভেতরে শুরু করেছেন। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে সরকার ইতোমধ্যেই প্রথমবারের মতন স্বাস্থ্য খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজেটকেও বরাদ্দ করেছে।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “তবে অবশ্যই এখানে শুধু সরকার না, সরকারের পাশাপাশি সরকারের সাথে সমগ্র বাংলাদেশে আপনারা যারা চিকিৎসক আছেন; সেটি উপজেলা পর্যায় হোক, জেলা পর্যায় হোক না কেন—সকল চিকিৎসককে সরকারি-বেসরকারি সকল চিকিৎসকদের এগিয়ে আসতে হবে।
“আপনাদের সহযোগিতা, সমর্থন, সাহায্য ছাড়া অবশ্যই সরকারের পক্ষে এগুলোকে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।”
ড্যাব সভাপতি হারুন আল রশিদের সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, ড্যাবের মহাসচিব জহিরুল ইসলাম শাকিল।
