কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক রোগীর নষ্ট দাঁতের পরিবর্তে পাশের সুস্থ দাঁত তুলে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। গত ১২ জুলাই হাসপাতালের ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগে এই ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার দুদিন পরেও ব্যথা আরও তীব্র হলে ভুক্তভোগী জানতে পারেন তার সুস্থ দাঁত তুলে ফেলার কথা।
এদিকে এ ঘটনায় চিকিৎসায় গুরুতর অবহেলা, অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকের অনুপস্থিতি এবং চিকিৎসা-নৈতিকতা লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছেন রোগীর পরিবার। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী নারী আনোয়ারা খাতুন কল্পনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আসাদুজ্জামান কাজলের মা। তিনি কুষ্টিয়া শহরের বসবাস করেন।
আনোয়ারা খাতুন কল্পনা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গত ১ জুলাই তীব্র দাঁতের ব্যথা নিয়ে তিনি কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন। সেখানে সহকারী ডেন্টাল সার্জন ডা. শারমিন জাহান পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানান, তার একটি দাঁতে বড় ধরনের ক্ষয় (ক্যাভিটি) হয়েছে এবং সেটি অপসারণ ছাড়া অন্য কোনো কার্যকর চিকিৎসা নেই। পরে তাকে ১২ জুলাই হাসপাতালে এসে দাঁত অপসারণের জন্য নির্ধারিত তারিখ দেওয়া হয়।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, নির্ধারিত দিনে অস্ত্রোপচারের পরও আনোয়ারা খাতুনের ব্যথা কমেনি। বরং ব্যথা আরও তীব্র হলে দুই দিন পর তিনি অন্য এক দন্ত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। সেখানে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক বলেন, যে দাঁতটি ক্ষতিগ্রস্ত ছিল সেটি অক্ষত রয়েছে। এর পরিবর্তে পাশের একটি সম্পূর্ণ সুস্থ দাঁত তুলে ফেলা হয়েছে।
রোগীর ছেলে ও ঢাবি শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামান কাজল গণমাধ্যমকে বলেন, দাঁত অপসারণের দিন অপারেশন কক্ষের দায়িত্বে ছিলেন একই ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. চন্দন কুমার পাল। কিন্তু তিনি অপারেশন কক্ষে উপস্থিত না থেকেই তার সহকারীকে দিয়ে একের পর এক রোগীর দাঁত অপসারণ করান।
আসাদুজ্জামান কাজল বলেন, মায়ের অস্ত্রোপচারের আগে ডা. চন্দন কুমার পাল মাত্র এক মিনিটের মতো অপারেশন কক্ষে অবস্থান করেন। এরপর তিনি পাশের কক্ষে বসে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছিলেন। সে সময় তার সহকারী কোনো চিকিৎসকের সরাসরি তত্ত্বাবধান ছাড়াই রোগীদের দাঁত অপসারণ করেন। বিষয়টি নিয়ে কথা বললে তিনি বলেন, ‘কোনো সমস্যা নেই, আমার সহকারীই করতে পারবে।’
ভুক্তভোগীর ছেলে আরও বলেন, অস্ত্রোপচারের পরও মায়ের ব্যথা না কমায় অন্য চিকিৎসকের কাছে যাই। তখন জানতে পারি, যে দাঁতটি তোলার কথা ছিল সেটি রয়ে গেছে, আর পাশের ভালো দাঁতটি তুলে ফেলা হয়েছে। এটি শুধু একটি চিকিৎসাগত ভুল নয়, একজন রোগীর প্রতি চরম অবহেলার উদাহরণ।
আসাদুজ্জামান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও যদি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে সাধারণ রোগীরা কী ধরনের চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যায়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. চন্দন কুমার পাল বলেন, দাঁত উঠানোর দায়িত্ব থাকে সার্জনের ওপর। সার্জন এবং তার সহকারীরা দাঁত তোলার কাজ করেন। বিভাগীয় প্রধানরা শুধু তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকেন। ভুক্তভোগী ওই রোগীর দুটি দাঁত নষ্ট ছিল। দুটি দাঁত একসাথে একই দিনে ওঠানো সম্ভব না হওয়ায় একটি দাঁত উঠানো হয়েছে আর নষ্ট আরেকটি দাঁত পরবর্তীতে ওঠানোর জন্য বলে দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ওনারা (রোগী পক্ষ) বিষয়টি বুঝতে না পেরে এমন অভিযোগ করছেন। এরপরও যদি কোনো অভিযোগ থাকে তাহলে লিখিত অভিযোগ দিলে সেটি তদন্ত করে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জানতে চাইলে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আনোয়ারুল কবীর বলেন, কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
