নীলফামারীর সৈয়দপুরে প্রস্তাবিত ১ হাজার শয্যার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণের স্থান প্রাথমিকভাবে উপযুক্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এখন প্রকল্পের বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই করতে চীনের আরেকটি কারিগরি দলের বাংলাদেশ সফরের অপেক্ষায় রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ।
চীনা কারিগরি দলটি কবে বাংলাদেশে আসবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সময়সূচি পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় চীনা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিনিধি দলের সফরের সময়সূচি জানতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) অনুরোধ করেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব ফাতেমা-তুজ-জোহরা ঠাকুরের স্বাক্ষর করা গত ২৯ জুলাইয়ের এক চিঠিতে ইআরডিকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
অন্যান্য সংবাদ
প্রাথমিক পরিদর্শনে উপযুক্ত সৈয়দপুরের হাসপাতাল নির্মাণের স্থান
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের চিঠি অনুযায়ী, চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সির (সিডকা) একটি কারিগরি দল গত ৫ থেকে ১৪ মে বাংলাদেশ সফর করে।
সফরের সময় প্রতিনিধি দলটি ৮ মে রংপুর এবং ৯ মে নীলফামারীতে প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতালের স্থান পরিদর্শন করে।
পরে ১৪ মে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় চীনা প্রতিনিধি দলের প্রধান জানান, প্রস্তাবিত স্থানে বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো আগে থেকেই থাকায় হাসপাতাল নির্মাণের জন্য স্থানটি উপযুক্ত।
বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই করবে চীনের আরেক দল
প্রাথমিক পরিদর্শনের পর চীনা প্রতিনিধি দলের প্রতিবেদন চীনা দূতাবাসে পাঠানো হবে। এরপর ইনভেস্টমেন্ট প্রজেক্ট ডকুমেন্ট (আইপিডি) প্রস্তুতের আগে চীনের আরেকটি কারিগরি দলের বাংলাদেশে এসে বিস্তারিত সমীক্ষা চালানোর কথা রয়েছে।
এই সমীক্ষায় প্রকল্পের কারিগরি বিভিন্ন দিক, অবকাঠামোগত প্রয়োজনীয়তা, হাসপাতালের পরিধি এবং সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করা হবে। পরবর্তী পর্যায়ে এসব তথ্যের ভিত্তিতেই আইপিডি প্রস্তুত করার কথা রয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত চীনা দূতাবাস কিংবা ইআরডির পক্ষ থেকে কারিগরি দলের সফরের সময়সূচি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়নি।
প্রকল্পের পরবর্তী কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নিতে তাই চীনা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে সফরের সময়সূচি জানার জন্য ইআরডিকে অনুরোধ করেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ।
২৫ একর জমিতে নির্মাণ হবে হাসপাতাল
সৈয়দপুর-নীলফামারী সড়কের পাশে চড়াইখোলা ইউনিয়নে দারওয়ানী টেক্সটাইল মিলসের সংলগ্ন প্রায় ২৫ একর জমিতে প্রস্তাবিত হাসপাতালটি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
নীলফামারী গণপূর্ত বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতাল নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে প্রায় ২৫ থেকে ২৮ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।
চীনের অনুদান সহায়তায় হাসপাতালটি নির্মাণের কথা রয়েছে। তবে প্রকল্পটির অর্থায়ন এখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে।
একনেকে শর্তসাপেক্ষ অনুমোদন, অর্থায়ন এখনো চূড়ান্ত নয়
চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল প্রকল্পটি শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন দেয়।
তবে চীনের অর্থায়নের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত না হওয়ায় প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন প্রক্রিয়া আটকে আছে। অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়া এবং বিস্তারিত কারিগরি সমীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর প্রকল্পটির পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
থাকবে ক্যানসার, হৃদরোগ ও কিডনি চিকিৎসার বিশেষায়িত সুবিধা
প্রস্তাবিত ১ হাজার শয্যার হাসপাতালটি চালু হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার সুযোগ তৈরি হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, হাসপাতালে থাকবে—
- অনকোলজি বা ক্যানসার চিকিৎসা
- নিউরোলজি বা স্নায়ুরোগ চিকিৎসা
- কার্ডিওলজি বা হৃদরোগ চিকিৎসা
- নেফ্রোলজি বা কিডনি রোগ চিকিৎসা
- শিশু ও নবজাতকদের নিবিড় পরিচর্যা সুবিধা
- উন্নত রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা
- ২০০ মেশিনসমৃদ্ধ ডায়ালাইসিস কেন্দ্র
বিশেষায়িত এসব চিকিৎসাসেবা চালু হলে উত্তরাঞ্চলের রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কমবে ঢাকার হাসপাতালের ওপর রোগীর চাপ
প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী, সৈয়দপুরে এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসা ব্যয় ও ভোগান্তি কমবে। একই সঙ্গে ঢাকার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত রোগীর চাপও কমানো সম্ভব হবে।
বিশেষ করে ক্যানসার, হৃদরোগ, কিডনি রোগ, স্নায়ুরোগ এবং শিশু ও নবজাতকের জটিল চিকিৎসার জন্য উত্তরাঞ্চলের মানুষকে ঢাকায় যেতে হয়। সৈয়দপুরে আধুনিক এই হাসপাতাল চালু হলে নিজ অঞ্চলের কাছাকাছি এসব চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
নীলফামারী ছাড়াও উপকৃত হবে আশপাশের জেলার মানুষ
নীলফামারীর সিভিল সার্জন আবদুর রাজ্জাক বলেন, হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হলে এ অঞ্চলের মানুষের উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর কিংবা ঢাকায় যেতে হবে না।
তিনি বলেন, এর সুফল শুধু নীলফামারীর বাসিন্দারাই পাবেন না। পঞ্চগড় ও গাইবান্ধাসহ পার্শ্ববর্তী জেলার মানুষও এই হাসপাতালের আধুনিক চিকিৎসাসেবা থেকে উপকৃত হবেন।
এখন নজর চীনা কারিগরি দলের সফরে
প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতালের জন্য প্রাথমিকভাবে স্থান উপযুক্ত বিবেচিত হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে আরও বিস্তারিত কারিগরি সমীক্ষা প্রয়োজন। চীনের পরবর্তী কারিগরি দলের সফর, সম্ভাব্যতা যাচাই এবং অর্থায়নের বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার ওপরই এখন প্রকল্পটির পরবর্তী অগ্রগতি অনেকটাই নির্ভর করছে।

