কিছুদিন আগে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম—“আজ এক বিরল ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইলাম। ফ্যাক্ট#২০ আগস্ট।” অনেকেই প্রশ্ন করেছিলেন, অনুরোধ করেছিলেন—বিষয়টি বিস্তারিত বলার জন্য। সঙ্গত কারণেই তখন কিছু বলিনি, কিছু লিখিনি। আজ মনে হলো, ঘটনাটি বলা যেতে পারে।
কারণ, ইতোমধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তাকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন।
প্রিয় মানুষ, প্রিয় নেতা, শ্রদ্ধাভাজন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও শুভকামনা।
অন্যান্য সংবাদ
গত ১০ আগস্ট ২০২৬ রাত সাড়ে ৮টার দিকে তিনি চিকিৎসার প্রয়োজনে ঢাকার রামপুরায় বাংলাদেশ মাল্টিকেয়ার হাসপাতালে আমার চেম্বারে এসেছিলেন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তার ওরাল এন্ড ডেন্টাল চিকিৎসার দায়িত্ব পালন করছি।
সার্জারি রুমে যাওয়ার পর আমি জিজ্ঞেস করলাম, ❝স্যার, আপনার বিষয়টা কি সিকিউরড হয়েছে?❞
স্যার বললেন, ❝ না। আমাকে তো এখনো কোনো কিছু জিজ্ঞেস করেননি । ❞
আমি আবার জানতে চাইলাম, ❝ আপনার মতামত জানতে চেয়েছেন? কোনোভাবে কোন মাধ্যমেই জানতে চাননি? ❞
তিনি বললেন, ❝ না। আমাকে তো ওই পদের কথা চিন্তা করলে আমার একটা ওপিনিয়ন চাইবেন। এখনো তো সেটা চাননি।❞
আমি জানতে চাইলাম, ❝ কোন মাধ্যমেও কি কোনো হিন্টস দিয়েছেন? কিছু বলেননি? ❞
তিনি বললেন, ❝ না। ❞
স্বাভাবিকভাবেই আমার মনটা কিছুটা দমে গেল। কারণ আমার ভেতরের একটি আকাঙ্ক্ষা ছিল, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন।
কেন এই আকাঙ্ক্ষা ছিল? কারণ রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে আমি তাকে দেখতে চেয়েছিলাম। বহু বছর খুব কাছ থেকে এই মানুষটিকে দেখার সুযোগ হয়েছে।
তার রাজনৈতিক জীবন, ব্যক্তিগত আচরণ, জীবনযাপন, সততা, দল ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ত্যাগ, শিক্ষা-দীক্ষা, মন-মানসিকতা, পারিবারিক ঐতিহ্য, ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে তার প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা —-
সবকিছু মিলিয়ে আমি তার মতো রাজনীতিবিদ এ কালে বিরল বলেই মনে করি। হয়তো আরও অনেকেই যোগ্য ছিলেন, আছেন। কিন্তু আমার চোখে তিনি সেরাদের সেরা। তার ব্যক্তিত্ব ও আচরণের অনেক কিছুই আমাকে সবসময় মুগ্ধ করেছে। তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও আস্থা বরাবরই গভীর।
শেষে আমি বললাম, স্যার, তাহলে সংবাদমাধ্যমগুলো যে আপনাকে রাষ্ট্রপতি বানিয়ে দিল!
তিনি হেসে বললেন, ❝ আর বলবেন না। এটা তো আমার জন্য এক বিপদ হয়েছে। আমি তো এখন ওদের ফোনও ধরি না! ❞
চিকিৎসা শেষে বসলাম চা খাওয়ার জন্য। আমার সহকারী চা বানাতে গেল। আমরা বসে আছি। সামনেই ছিলেন স্যারের ব্যক্তিগত সহকারী দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মানুষ ইউনুস আলী ও আমার বন্ধু দিপু।
এক মিনিটও হয়নি — হঠাৎ বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্যারের মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠল। তিনি ফোন ধরলেন।
কথোপকথন শুনে বুঝতে পারলাম, ফোনের অপর প্রান্তে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্যার বলছিলেন, ❝ আমরা তো সবাই আপনার ওপরেই দায়িত্ব দিয়েছি। আপনি যেটা ভালো মনে করবেন, সেটাই করবেন। সেটাই আমাদের মত। ❞
তারপর ওই প্রান্ত থেকে যে কথা এলো তার জবাবে স্যার শুধু বললেন, ❝ আমাকে দায়িত্ব দিলে আমি দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করব।❞
আমি বুঝতে পারলাম, অপর প্রান্ত থেকে জানতে চাওয়া হয়েছে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাকে মনোনয়ন দেওয়ার ব্যাপারে তার নিজের মতামত বা ইচ্ছা কী।
এরপর (সম্ভবত ) জানতে চাওয়া হলো, বিকল্প হিসেবে আর কারা হতে পারেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্যার বললেন,❝ খন্দকার মোশাররফ সাহেব আছেন, তার কথা ভাবতে পারেন। এছাড়া নজরুল ভাই আছেন, ড. মঈন খান আছেন। তাদের কথাও ভাবতে পারেন। এর বাইরেও আপনার যদি কারও কথা মনে হয়, আপনি তাও ভাবতে পারেন। সবকিছু বিবেচনা করে আপনি যেটা সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটাই আমাদের সিদ্ধান্ত।❞
এরপর ফোনের কথোপকথন শেষ হলো। আমি তখন অত্যন্ত আশাবাদী হয়ে হাসিমুখে স্যারের দিকে তাকালাম। বললাম, ❝ স্যার, if it happens, তাহলে আমি এবং আমার এই রুম একটি বিরল ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রইলাম।❞
তিনি হেসে বললেন, ❝ You always make history❞
হয়তো তিনি আমাকে স্নেহ করে, নিছক মজা করেই কথাটি বলেছিলেন। কিন্তু আমার মনে হলো, সত্যিই যেন আমি এক বিরল ইতিহাসের সাক্ষী হতে যাচ্ছি।
ভাবুন তো, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে প্রথমবার তার মতামত জানতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ফোন করেছেন, আর সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে আমি উপস্থিত ছিলাম তার সামনে, আমার নিজের চেম্বারের ডক্টরস রুমে!
বিষয়টি খুবই কাকতালীয়। তবুও এতে সত্যিই আমি অভিভূত। এরপরই আমি ফেসবুকে সেই ছোট্ট স্ট্যাটাসটি দিয়ে রেখেছিলাম,
“আজ এক বিরল ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইলাম। ফ্যাক্ট#২০ আগস্ট।”
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আজ বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত। আমরা একজন অনন্য ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে পেয়েছি। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ব্যক্তিগত আচরণে, চিন্তা-চেতনায় এবং মানুষের সঙ্গে ব্যবহারে কতটা সংবেদনশীল তা তার কাছের মানুষরা নিশ্চয়ই জানেন।
তার সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের সুবাদে এমন অনেক ছোট ছোট মুহূর্ত দেখেছি, যেগুলো তার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আমাকে বারবার মুগ্ধ করেছে।
তিনি যখন আমার চেম্বারে চিকিৎসার জন্য আসতেন, অনেক সময়ই হাতে করে কিছু না কিছু নিয়ে আসতেন। কখনো শার্ট, টাই, স্যুট পিস। কখনো আমার সন্তানদের জন্য চকোলেট।
বিষয়টি অনেকের কাছে খুব সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে এটি শুধুই গিফ্ট মনে হয়নি । এটা একটা ভালোবাসার অনুভূতি । এ ক্ষেত্রে অনেকের থেকেই তিনি আলাদা।
কারণ, একজন মানুষ যখন অন্য একজনকে মনে রাখেন, তার পরিবার ও সন্তানদের কথা ভাবেন এবং নিজের ব্যস্ততার মধ্যেও তাদের জন্য মনে করে কিছু নিয়ে আসেন, তখন সেই ছোট্ট কাজটির মধ্যেও তার বড় মনের পরিচয় পাওয়া যায়।
আমি অভিভূত হয়ে ভাবতাম, এই মানুষটি কত সামান্য বিষয়কেও কী অসামান্য সম্মানের সঙ্গে দেখতে জানেন!
আজ সেই মানুষটিই আমাদের রাষ্ট্রের অভিভাবকের দায়িত্বে।
সেদিনের সেই কথোপকথন তখন আমার কাছে নিছক একটি ব্যক্তিগত মুহূর্ত ছিল। কিন্তু আজ, ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে, মনে হচ্ছে—সেদিন আমি সত্যিই বিরল এক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ছিলাম।
কিছু মুহূর্ত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। ১০ আগস্টের সেই সময়টা আমার কাছে তেমনই একটি তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত।
ইতিহাস কখনো কখনো খুব নীরবে আমাদের সামনে দিয়ে হেঁটে যায়। আর ভাগ্যবান হলে, আমরা তার সাক্ষী হয়ে থাকি। আমি এ ক্ষেত্রে তেমনি এক ভাগ্যবান।
রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে আমরা একজন সজ্জন মানুষ পেয়েছি। একজন যোগ্য মানুষ পেয়েছি। একজন সংবেদনশীল ও মানবিক মানুষকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পেয়েছি, এটাই আমার কাছে আনন্দের ও গর্বের বিষয়।
শুভকামনা আমাদের প্রিয় মানুষ, প্রিয় নেতা, রাষ্ট্রের অভিভাবক মহামান্য রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
ভালো থাকবেন স্যার। দেশ ও মানুষের পক্ষে থাকবেন। আল্লাহ আপনার সহায় হোন। শুভ হোক আপনার পথচলা।

